লালবাগ কেল্লায় সন্ধ্যার পর কখনো একা থেকেছেন?
কেল্লার প্রাচীন দেয়ালে সন্ধ্যার ছায়া আর সেই বন্ধ দরজার হাতছানি…
পুরান ঢাকার ঐতিহাসিক লালবাগ কেল্লা। দিনের বেলায় এই প্রাচীন দুর্গের চত্বর দেখে কারো মনে ভয় পাওয়ার দূরতম কোনো কারণ নেই। পর্যটকদের আনাগোনা, ক্যামেরা ও ফোনের শাটারের ক্লিক, ছবি তোলার হিড়িক আর চারপাশ ঘিরে থাকা পুরান ঢাকার চেনা পরিচিত কোলাহল।
কিন্তু একটা কথা বহু বছর ধরে লোকমুখে ফিসফাস করে শোনা যায়—মানুষ চলে যাওয়ার পর নাকি লালবাগ কেল্লা আর ঠিক একই জায়গা থাকে না…
ঘটনাটা আমাকে বলেছিলেন পুরান ঢাকার এক বয়স্ক মানুষ। তখন অনেক বছর আগের কথা। কেল্লার আশপাশের অলিগলি তখন এখনকার মতো এত ভিড়ে ঠাসা বা ব্যস্ত ছিল না।
এক পড়ন্ত সন্ধ্যায় পরিচিত একজনের সঙ্গে গল্প করতে করতে বেশ খানিকটা দেরি হয়ে যায় তার। খেয়াল করে দেখলেন, চারপাশ ততক্ষণে প্রায় জনমানবহীন, নিস্তব্ধ। কেল্লার প্রতিটি প্রাচীন দেয়ালে সন্ধ্যার অন্ধকার ধীরে ধীরে জমাট বেঁধে ভারী হয়ে আসছে।
ঠিক তখনই একটা অদ্ভুত শব্দে তিনি থমকে দাঁড়ালেন। কেউ একজন কাঁদছে!
খুব আস্তে, চাপা একটা গোঙানির মতো শব্দ। স্পষ্টতই একজন মহিলার গলা। প্রথমে তিনি ভেবেছিলেন হয়তো মনের ভুল, তাই বেশি গুরুত্ব দেননি। কিন্তু কয়েক সেকেন্ড পেরোতেই শব্দটা আবার ফিরে এলো।
এবার শব্দটা আগের চেয়ে একটু বেশি স্পষ্ট। কান্নাটা যেন ভেসে আসছে কেল্লার নির্জন ভেতরের দিকটা থেকে। তিনি কৌতূহল আর এক অজানা টানে কয়েক পা এগিয়ে গেলেন।
আর তখনই সেই দৃশ্যটি তার চোখে পড়ল…
কেল্লার একটা বহু পুরনো পাথুরে দরজার সামনে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে আছেন একজন নারী। পরনে দীর্ঘ এক অদ্ভুত পোশাক, মাথা ও শরীর সম্পূর্ণ ঢাকা। মানুষটির দিকে তিনি পেছন ফিরে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন।
লোকটি একটু সাহস সঞ্চয় করে কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করলেন—
মহিলাটি কোনো উত্তর দিলেন না। নীরবতা যেন আরো পাথর হয়ে গেল। এরপর তিনি খুব ধীরে ধীরে একটা হাত ওপরে তুললেন। তার আঙুল নির্দেশ করছিল সামনের সেই প্রাচীন দরজার দিকে।
লোকটি ইতস্তত করে বললেন—
“ওদিকে তো যাওয়ার কোনো রাস্তা নেই।”
এবার মহিলাটি খুব ধীরগতিতে তার মাথাটা পেছন দিকে ঘোরালেন। কিন্তু পুরো মুখটা ছায়ার কারণে স্পষ্ট দেখা গেল না। শুধু বাতাসে এক বরফশীতল কণ্ঠস্বর ভেসে এলো—
“দরজাটা খুলে দিন…”
শব্দটা শোনামাত্র লোকটির মেরুদণ্ড দিয়ে যেন ঠান্ডা স্রোত বয়ে গেল। তিনি আর এক পা-ও সামনে এগোলেন না, বরং সন্তর্পণে কয়েক পা পিছিয়ে এলেন।
যেন বহু শত বছর ধরে বন্ধ কোনো ভারী লোহার কবাট ভেতর থেকে কেউ সজোরে আছড়ে বন্ধ করে দিল!
লোকটি চমকে পেছনে তাকালেন। কয়েক সেকেন্ডের বিহ্বলতা। আবার সামনে দৃষ্টি ফেরাতেই তিনি স্তব্ধ হয়ে গেলেন—সেখানে কেউ নেই! পুরো চত্বর সম্পূর্ণ ফাঁকা, শুধু হিম বাতাস বইছে।
তিনি আর এক মুহূর্তও সেখানে অপেক্ষা করার দুঃসাহস দেখাননি। দ্রুত পায়ে দুর্গের প্রধান ফটকের দিকে ছুটতে শুরু করলেন।
কিন্তু কিছুদূর যাওয়ার পরই তার বুকের ভেতরটা শুকিয়ে গেল। স্পষ্ট মনে হলো—তার ঠিক পেছনে পেছনে কেউ একজন হেঁটে আসছে!
তিনি থামলেন। পেছনের পায়ের শব্দটাও সাথে সাথে থেমে গেল। আবার হাঁটতে শুরু করলেন—
এবার তিনি আর পেছনে তাকানোর সাহস পাননি। জীবনের সবটুকু শক্তি দিয়ে একরকম দৌড়ে কেল্লার সীমানা পেরিয়ে রাজপথে এসে থামলেন।
কিন্তু ঘটনার আসল চমকটা অপেক্ষা করছিল বাইরে…
কেল্লা থেকে বেরিয়ে পরিচিত এক চায়ের দোকানে বসে এক প্রবীণ বাসিন্দাকে কাঁপতে কাঁপতে ঘটনাটা খুলে বললেন তিনি। সবটা শোনার পর বয়স্ক লোকটি দীর্ঘক্ষণ কোনো কথা বললেন না। কেবল এক দৃষ্টিতে চেয়ে রইলেন।
তারপর শান্ত কিন্তু গম্ভীর গলায় শুধু একটা প্রশ্ন করলেন—
লোকটি হকচকিয়ে গিয়ে বললেন, “হ্যাঁ! কিন্তু আপনি কীভাবে জানলেন?”
প্রবীণ মানুষটি কিছু মুহূর্ত তার মুখের দিকে তাকিয়ে গভীর এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন—
লালবাগ কেল্লাকে ঘিরে এমন অজস্র রহস্যময় অভিজ্ঞতা, অদ্ভুত ছায়া আর অদৃশ্য উপস্থিতির লোককথা বহু যুগ ধরে ঢাকা শহরের অলিতে-গলিতে ঘুরে বেড়াচ্ছে। এর কোনটা মানুষের অতি-কল্পনা, আর কোনটা বাস্তবের গা-ছমছমে সত্যি—তা নিশ্চিত করে বলা কঠিন।
তবে একটা ব্যাপার আজও খুব অদ্ভুত—পুরান ঢাকার প্রবীণ কোনো মানুষের কাছে গিয়ে যদি আপনি লালবাগ কেল্লার রহস্যের কথা জানতে চান, অনেকেই সঙ্গে সঙ্গে গল্প শুরু করেন না। তার আগে মুচকি হেসে একটা পাল্টা প্রশ্ন ছুড়ে দেন—
📌 লালবাগ কেল্লার রহস্য সম্পর্কিত তথ্য ও সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
প্রশ্ন: লালবাগ কেল্লার সুড়ঙ্গ বা গোপন দরজা নিয়ে কী লোককথা প্রচলিত আছে?
উত্তর: লোকমুখে শোনা যায়, লালবাগ কেল্লার ভেতরে এমন কিছু গোপন সুড়ঙ্গ বা প্রবেশদ্বার রয়েছে যার ওপাশে গেলে কেউ আর ফিরে আসত না। ইংরেজ আমল থেকেই এই দরজা ও সুড়ঙ্গগুলো নিয়ে ঢাকার ইতিহাসে নানা অলৌকিক গল্প ছড়িয়ে আছে।
প্রশ্ন: সন্ধ্যার পর কি লালবাগ কেল্লার ভেতরে থাকা যায়?
উত্তর: না। সরকারি নিয়ম ও নিরাপত্তার স্বার্থে সূর্য ডোবার সাথে সাথেই দর্শনার্থীদের জন্য কেল্লা বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং রাতের বেলা সাধারণ প্রবেশ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
আপনার কি কোনো গা-ছমছমে অভিজ্ঞতা আছে?
আপনি কি লালবাগ কেল্লা বা পুরান ঢাকার কোনো ঐতিহাসিক স্থানকে ঘিরে এমন অদ্ভুত ঘটনার সাক্ষী? বিশেষ করে পুরান ঢাকার কেউ থাকলে নিচে কমেন্টে আপনার অভিজ্ঞতা আমাদের জানান। কারণ লালবাগ কেল্লার আরও কিছু না বলা গল্প এখনো অন্ধকারে রয়ে গেছে…
💬 নিচে মন্তব্য লিখুন
0 Comments